কেমিক্যাল-গুদাম-ছড়িয়ে-পড়ছে-পুরো-ঢাকায়

কেমিক্যাল গুদাম ছড়িয়ে পড়ছে পুরো ঢাকায়


পুরান ঢাকার বড়কাটরার একটি আবাসিক ভবনের দ্বিতীয় তলায় ছিল আবেদা কসমেটিকসের রাসায়নিক গুদাম ও প্রসাধনীর কারখানা। চকবাজার ট্র্যাজেডির পর প্রশাসনের চাপের মুখে তা সরিয়ে নেওয়া হয় কেরানীগঞ্জের খোলামোড়া হাসপাতাল রোডের একটি আবাসিক এলাকায়। সেখানে দাহ্য রাসায়নিক মজুদ করে প্রসাধনী তৈরি করা হচ্ছে। এতে ঝুঁকিতে পড়েছেন ওই এলাকার বাসিন্দারা। অনেকের মধ্যে আতঙ্কও দেখা গেছে।


Hostens.com - A home for your website

শুধু কেরানীগঞ্জ নয়, সিটি করপোরেশন ও টাস্কফোর্সের অভিযানের পর বাড্ডা, ধানমণ্ডি, যাত্রাবাড়ী, মোহাম্মদপুর, কামরাঙ্গীরচর, হাজারীবাগ, মুগদা, বাসাবো ও মিরপুরের ঘনবসতিপূর্ণ এলাকায় অনেক ব্যবসায়ী কেমিক্যালের মজুদ সরিয়ে নিয়েছেন। কেউ কেউ সরিয়ে নিয়েছেন গাজীপুর, টঙ্গী ও নারায়ণগঞ্জে। অনেকেই এসব এলাকায় নতুন করে কারখানা চালু করেছেন। কেমিক্যাল গুদামে আগুনের ঝুঁকি থাকায় এসব এলাকার বাসিন্দারাও উদ্বিগ্ন। সমকালের এই প্রতিবেদক বেশ কয়েকটি এলাকা ঘুরে দেখতে পান, পুরান ঢাকার বহু কারখানা এখন রাজধানীর বিভিন্ন এলাকায় ছড়িয়ে পড়েছে। যার যেখানে সুবিধা, তিনি সেখানে তার গুদাম সরিয়ে নিচ্ছেন। এতে নতুন করে ঝুঁকি তৈরি হচ্ছে। এ বিষয়ে প্রশাসনের কোনো নজরদারিও নেই।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের মেয়র মোহাম্মদ সাঈদ খোকন সমকালকে বলেন, পুরান ঢাকার দাহ্য কেমিক্যালের গোডাউন ও কারখানা নিরাপদ এলাকায় সরিয়ে নিতে বলা হয়েছে, যেখানে ঘনবসতি নেই। আবাসিক এলাকায় কিংবা আবাসিক ভবনে রাসায়নিক গুদাম স্থানান্তর করা মোটেই উচিত হবে না। সুনির্দিষ্ট অভিযোগ পেলে ব্যবস্থা নেওয়া হবে। সিটি মেয়র আরও বলেন, পরিকল্পিত কেমিক্যাল গোডাউন স্থানান্তরের জন্য উদ্যোগ নিয়েছে শিল্প মন্ত্রণালয়। সাময়িক স্থানান্তরের জন্য গোডাউন প্রস্তুত করতে ছয় মাস সময় লাগবে। এখন ব্যবসায়ীরা নিরাপদে সরিয়ে নিলে ছয় মাস পর তারা পরিকল্পিত গোডাউনে রেখে ব্যবসা করার সুযোগ পাবেন।

গত ২০ ফেব্রুয়ারি চকবাজারের চুড়িহাট্টায় পারফিউমের কারখানা ও গোডাউনে আগুনে ৭১ জন প্রাণ হারান। এরপর ২৮ ফেব্রুয়ারি থেকে রাসায়নিক গুদাম সরাতে নিয়মিত অভিযান চলছে। শিল্প মন্ত্রণালয় কেমিক্যাল পল্লী স্থাপনের উদ্যোগ নিয়েছে। সাময়িকভাবে পুরান ঢাকার এই গোডাউন সরাতে দুটি প্রকল্প নেওয়া হয়েছে।

শ্যামপুরের উজালা ম্যাচ ফ্যাক্টরি এলাকা এবং টঙ্গীতে বিএসইসির জমিতে গোডাউন আপাতত স্থানান্তর করা হবে। প্রকল্প প্রস্তাব অনুযায়ী আগামী বছরের জুনে এই কাজ শেষ হবে। অর্থাৎ এক বছরের বেশি সময় লাগবে। এখন ব্যবসায়ীরা পরিকল্পিত গোডাউন না পাওয়ায় যে যার মতো যেখানে-সেখানে সরিয়ে নিচ্ছেন। এতে দাহ্য কেমিক্যালের মজুদ ছড়িয়ে পড়ছে রাজধানীজুড়ে। সংশ্নিষ্ট অনেকে আশঙ্কা ব্যক্ত করে বলেছেন, ভালোর জন্য গোডাউন সরাতে গিয়ে পরিণাম আরও খারাপ হতে পারে।

পুরান ঢাকার একটি কসমেটিকসের কারখানায় নেইলপলিশসহ নানা প্রসাধনী তৈরি হয়। এই প্রতিষ্ঠানের মালিক নাম না প্রকাশের শর্তে সমকালের এ প্রতিবেদককে বলেন, ’অনেক বিপদে আছি, নতুন করে কিছু লিখে আর বিপদে ফেলবেন না। গুদাম সরানোর নিরাপদ জায়গা আসলে নেই। ঢাকার প্রত্যেক এলাকা ঘনবসতিপূর্ণ। কোথায় নেব আপনিই বলেন?’ সরেজমিন অনুসন্ধানে দেখা যায়, পুরান ঢাকার আরমানিটোলার রাজীব কেমিক্যালের গোডাউন সরানো হয়েছে কেরানীগঞ্জের চুনকুটিয়া আবাসিক এলাকায়। ওই গোডাউন একটি বহুতল বাড়ির নিচতলায়। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এই ব্যবসায়ী জানান, সিটি করপোরেশনের চাপে কোনো উপায় না পেয়ে মজুদ কেমিক্যাল চুনকুটিয়ায় ভাড়া বাড়িতে সরিয়ে নিয়েছেন। কিন্তু বাড়ির মালিক কেমিক্যাল মজুদের কথা জানতে পেরে বাসা খালি করার তাগিদ দিয়েছেন। বাড়তি টাকা ভাড়া দেওয়ার কথা বললেও বাড়ির মালিক তাতে রাজি হননি। তিনি কোনোভাবেই কেমিক্যাল রাখতে দেবেন না বলে জানিয়েছেন। এখন কেমিক্যাল নিয়ে বিপদে পড়েছেন তিনি।

নাম প্রকাশ না করার শর্তে মিটফোর্ডের এক কেমিক্যাল ব্যবসায়ী জানান, গোডাউন স্থানান্তরের জন্য ব্যবস্থা না করে সরিয়ে নিতে চাপ দেওয়া হচ্ছে। এতে বাধ্য হয়ে হাজারীবাগের ট্যানারির খালি গোডাউনে তিনি গুদাম সরিয়ে নিয়েছেন। সরেজমিন ঘুরে দেখা যায়, হাজারীবাগের ট্যানারি মোড় ধরে সামনে এগিয়ে একটি সরু গলির মাথায় সাততলা বাড়ির নিচতলার ট্যানারির ফাঁকা জায়গায় স্তূপ করে রাখা হয়েছে বস্তা ও ড্রামভর্তি কেমিক্যাল। ট্যানারি সরিয়ে নেওয়ায় পুরো এলাকা আবাসিক। এই এলাকায় এখন অনেক ভবনে দাহ্য কেমিক্যাল মজুদ করা হয়েছে। স্থানীয়রা জানান, হাজারীবাগ থেকে ট্যানারি সরলেও ট্যানারিতে ব্যবহূত কেমিক্যাল গুদাম সরানো হয়নি। ওই কেমিক্যালের সঙ্গে নতুন করে আরও কেমিক্যাল এখানে মজুদ হচ্ছে।

পুরান ঢাকার মৌলভীবাজারের মকিমকাটরার ব্যবসায়ী মো. শাজাহান দাহ্য কেমিক্যাল দিয়ে তৈরি করেন আগরবাতি ও তারাবাতি। ওই এলাকায় তার দুটি দাহ্য কেমিক্যাল গোডাউন খালি করার নির্দেশ দিয়েছে টাস্কফোর্স। ওই গোডাউনের কেমিক্যাল কেরানীগঞ্জের কালিন্দির কারখানার গোডাউনে স্থানান্তর করা হয়েছে বলে জানান প্রতিষ্ঠানের কর্মচারী মো. ফিরোজ ও মশিউর রহমান। বংশালের একটি কেমিক্যালের দোকানের কর্মচারী মো. ইব্রাহীম বলেন, পরিকল্পিত জায়গা না পাওয়ায় তারা দ্রুত গোডাউন খালি করতে যাত্রাবাড়ীর একটি বাসার বেসমেন্টে সরিয়ে নিয়েছেন। তাদের মতো অনেকেই বিভিন্ন এলাকায় আবাসিক কিংবা বাণিজ্যিক ভবনের মধ্যে কেমিক্যাল সরিয়ে নিয়েছেন।

জগন্নাথ সাহা রোডের জামাল কেমিক্যাল স্থানান্তর করা হয়েছে কামরাঙ্গীরচরে। পুরান ঢাকার মতোই ঘনবসতিপূর্ণ এলাকা কামরাঙ্গীরচর। এখানে আগুন লাগলে একই পরিস্থিতি তৈরি হবে বলে মনে করছেন স্থানীয় বাসিন্দা জাফর আহমেদ।

আরমানিটোলার নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একাধিক কেমিক্যাল ব্যবসায়ী জানান, পুরান ঢাকা থেকে কেমিক্যাল নিয়ে যাওয়ার জায়গা পাচ্ছেন না তারা। কিন্তু পেছনে তাড়া করছে টাস্কফোর্স। এ অবস্থায় অনেকে বিভিন্ন এলাকায় কয়েকগুণ বাড়তি টাকার বিনিময়ে গোডাউন ভাড়া করে গোপনে কেমিক্যাল সরিয়েছেন। কিন্তু এখন তারা আর গোডাউন ভাড়া পাচ্ছেন না। এ কারণে অনেকে রাজধানীর মধ্যে বিভিন্ন এলাকায় নিজের বাসায় কিংবা আত্মীয়দের বাড়িতে সাময়িকভাবে সরিয়ে রেখেছেন। এভাবে গোপনে কেমিক্যাল থাকলে তাতে দুর্ঘটনা হলে পরিণতি আরও ভয়াবহ হবে।

সমকালের কেরানীগঞ্জ প্রতিনিধি মোহাম্মদ রায়হান খান জানান, ব্রাহ্মণকীর্তা এলাকা ঘুরে তিনটি কেমিক্যাল গোডাউন তালাবদ্ধ অবস্থায় দেখেছেন। এসব গোডাউন আবাসিক এলাকার মধ্যে। একটি গোডাউনের পাশের ভবনে বসবাস করছে অনেক পরিবার। আরেক পাশে আছে একটি গরুর খামার। অন্য গোডাউনগুলোর চারপাশে বসতবাড়ি রয়েছে। এই এলাকায় গোডাউন ছাড়াও অনেক বসতবাড়ির মধ্যে ভাড়া বাসায় কেমিক্যাল মজুদ আছে।

রাজধানী ও আশপাশের এলাকা ঘুরে গোডাউন সরানোর আরও অনেক তথ্য মিলেছে। এসব এলাকার বাসিন্দাদের ভাষ্য একই। কেমিক্যাল গোডাউন নিয়ে তারাও আতঙ্কে আছেন। কেরানীগঞ্জের চুনকুটিয়ার চা দোকানি সোহেল আরমান জানান, ওই এলাকায় অনেক বাড়িতে কেমিক্যাল মজুদ করা হয়েছে। বেশিরভাগই আবাসিক ভবনের মধ্যে। এসব মালপত্র রাতে আনা-নেওয়া করা হয়। দিনের বেলায় তেমন একটা চোখে পড়ে না।

পুরান ঢাকার হক কেমিক্যালের ফারুক সরকার মজিদ সমকালকে বলেন, বেশিরভাগ ব্যবসায়ী অগ্নিকাণ্ডের দুর্ঘটনার পর আর নতুন করে এসিড নিয়ে আসেননি। তারা পুরান ঢাকার গোডাউনে থাকা মালপত্র বিক্রি করে দিয়েছেন। নতুন করে আর তোলেননি। গোডাউন খালি করার নির্দেশনা দিয়েছে টাস্কফোর্স। সরকার পরিকল্পিত গোডাউন কিংবা জায়গাও দেয়নি। এ অবস্থায় অনেক এসিড ব্যবসায়ী ব্যবসা বন্ধ করে দিয়েছেন। তার মতে, এতে কোনো সমাধান আসেনি। উল্টো ঢাকার বিভিন্ন এলাকায় দাহ্য পদার্থ ছড়িয়ে পড়েছে। দ্রুত এ বিষয়টির সমাধান হওয়া উচিত। তিনি বলেন, এভাবে গোপনে বিভিন্ন জায়গায় কেমিক্যাল রেখে ব্যবসা করা সম্ভব নয়। ব্যবসা বন্ধ থাকলে আরও ক্ষতির মুখে পড়বে স্থানীয় শিল্প। তারা বলেন, ঢাকার বিভিন্ন এলাকায় গোপনে মজুদ রাখায় এ সম্পর্কে জানতে পারছে না ফায়ার সার্ভিস কিংবা বিস্ম্ফোরক পরিদপ্তর। ফলে আরও বেশি দুর্ঘটনার ঝুঁকি তৈরি হচ্ছে।

ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্সের উপপরিচালক দিলীপ কুমার ঘোষ সমকালকে বলেন, কেমিক্যাল গোডাউন অবশ্যই অগ্নিনিরাপত্তা পরিকল্পনা অনুযায়ী হতে হবে। যত্রতত্র রাখার সুযোগ নেই। পুরান ঢাকার মতো যেখানে রাখা হবে সেখানেই ঝুঁকি তৈরি হবে। তিনি বলেন, ২০১০ সালে নিমতলী ট্র্যাজেডির পর পুরান ঢাকার কোনো কেমিক্যালের গোডাউনের সনদ দেয়নি ফায়ার সার্ভিস। লাইসেন্স ছাড়া কোনো প্রতিষ্ঠান অবৈধভাবে ব্যবসা করলে তার বিরুদ্ধে অবশ্যই ব্যবস্থা নেবে প্রশাসন। নিরাপত্তা পরিকল্পনা ছাড়া কোনো প্রতিষ্ঠান এই দাহ্য কেমিক্যালের ব্যবসা করতে পারে না।

ব্যবসায়ীদের শীর্ষ সংগঠন এফবিসিসিআইর কেমিক্যাল বিষয়ক স্ট্যান্ডিং কমিটির সভাপতি ও বাংলাদেশ কেমিক্যাল অ্যান্ড পারফিউমারি মার্চেন্ট অ্যাসোসিয়েশনের সাবেক সাধারণ সম্পাদক মো. বেলায়েত হোসেন সমকালকে বলেন, পরিকল্পিত কেমিক্যাল পল্লী নির্মাণ করতে সময় লাগবে। এ অবস্থায় কেমিক্যাল গোডাউন স্থানান্তরে চাপ দিচ্ছে টাস্কফোর্স। নিয়মিত অভিযান চালিয়ে জরিমানা করছেন তারা। এখন ব্যবসায়ীরা পড়েছেন বড় বিপদে। প্রশাসনের চাপে পড়ে তারা যে যার মতো বিভিন্ন স্থানে কেমিক্যাল সরিয়ে নিচ্ছেন। এতে দুর্ঘটনার ঝুঁকি আরও ছড়িয়ে পড়ছে। দ্রুত কেমিক্যাল গুদাম নির্মাণের জন্য সরকারের প্রতি দাবি জানান তিনি।

Facebook Comments

" জাতীয় খবর " ক্যাটাগরীতে আরো সংবাদ

Web Hosting and Linux/Windows VPS in USA, UK and Germany

Visitor Today : 20

Visitor Yesterday :