শোকে-পাথর-লংকা

শোকে পাথর লংকা


সেইন্ট সেবাস্তিয়ান গির্জায় একটির পর একটি কফিন নামানো হচ্ছিল। এর মধ্যে কয়েকটি বেশ ভারী। বাকিগুলো খুবই ছোট। বুলডোজার দিয়ে খোঁড়া হচ্ছিল সমাধি। তীব্র গরমের মধ্যে ঘামে ভিজে খালি পায়ে সমাধিতে মরদেহগুলো রাখছিলেন অনেকে। ১১ বছরের একটি শিশুকে শেষ বিদায় জানাতে এসেছিল একটি পরিবার। তারা এসেছিলেন ছেলের সহপাঠীকে বিদায় জানাতে।


Hostens.com - A home for your website

এই পরিবারের নারী সদস্য লাসান্থি আনুষা বলেন, "কী বলব ভেবে পাচ্ছি না। ওরা তো খুবই ছোট ছিল।" শ্রীলংকায় বর্বরোচিত সন্ত্রাসী হামলায় নিহতদের শেষ বিদায়ের দৃশ্য এটি। রোববারের ওই নৃশংস হামলায় লংকার মানুষ এখন শোকে পাথর। ঘটনাটি নাড়া দিয়েছে বিশ্ববিবেককেও। বোমা হামলায় সবচেয়ে বেশি প্রাণহানির ঘটনা ঘটেছে কলম্বোর উত্তরের নেগোম্বো শহরের এই সেবাস্তিয়ান গির্জায়। এখানে আত্মঘাতী হামলায় মারা গেছেন ১০০ জন। গতকাল মঙ্গলবার নিহত অনেককে গণশেষকৃত্যের পর গণকবরে সমাহিত করা হয়। এদিন রাষ্ট্রীয় শোক দিবসে পালন করা হয় তিন মিনিটের নীরবতা। অনেকে অশ্রুভেজা চোখে মাথা নুইয়ে নিহতদের শ্রদ্ধা জানান।

শ্রীলংকাজুড়ে ছয়টি স্থানে একযোগে আত্মঘাতী সিরিজ হামলায় নিহতের সংখ্যা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৩২১ জনে। কলম্বো পুলিশের মুখপাত্র রাবণ গুনাসেকারা গতকাল এক বিবৃতিতে জানান, হামলায় আহত পাঁচ শতাধিক মানুষের মধ্যে বেশ কয়েকজন হাসপাতালে মারা যাওয়ায় নিহতের সংখ্যা বেড়েছে। নিহতের মধ্যে বিদেশি ৪৫ জন। এ পর্যন্ত সন্দেহভাজন ৪০ জনকে আটক করেছে পুলিশ। তাদের সবাই শ্রীলংকান। খবর বিবিসি, নিউইয়র্ক টাইমস, রয়টার্স ও এএফপির।

আড়াই দশকের গৃহযুদ্ধে বিধ্বস্ত শ্রীলংকায় এক দশকের মধ্যে এটি ছিল সবচেয়ে বড় হামলা। তবে হামলার ১০ দিন আগেই ভারত ও যুক্তরাষ্ট্রের গোয়েন্দা সংস্থা শ্রীলংকার নিরাপত্তা বাহিনীকে সতর্ক করে দিয়েছিল। ভারত সরকারের এক সূত্রের উদ্ধৃতি দিয়ে এনডিটিভির খবরে বলা হয়েছে, হামলার বিষয়ে শ্রীলংকাকে ৪ ও ২০ এপ্রিল দুই দিন সতর্ক করা হয়েছিল।

তারপরও কোনো প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা নেয়নি সরকার। এ নিয়ে তীব্র সমালোচনার মধ্যে পড়েছে ভারত মহাসাগরের দ্বীপরাষ্ট্রটির সরকার। তবে সরকারেরই একজন মন্ত্রী বলেছেন, প্রধানমন্ত্রী রনিল বিক্রমাসিংহকে এটি জানানো হয়নি। আবার প্রেসিডেন্ট মাইথ্রিপালা সিরিসেনার সঙ্গে দ্বন্দ্বের কারণে নিরাপত্তা বিষয়ক সভাগুলোতেও যোগ দেননি তিনি।

শ্রীংলকার প্রতিরক্ষা প্রতিমন্ত্রী গতকাল সংসদে বলেছেন, নিউজিল্যান্ডের ক্রাইস্টচার্চে হামলার প্রতিশোধ নিতেই এ হামলা চালিয়েছে ইসলামী জঙ্গিরা। তবে কিসের ভিত্তিতে তিনি এ দাবি করেছেন, তা বিস্তারিত জানাননি। তথাকথিত ইসলামিক স্টেট (আইএস) এ হামলার দায় স্বীকার করেছে। তবে জঙ্গি সংগঠনটি তাদের দাবির পক্ষে কোনো প্রমাণ হাজির করেনি।

তিন মিনিটের নীরবতা :নিহতদের স্মরণে তিন মিনিটের নীরবতা পালন করেছে শ্রীলংকা। বহাল আছে জরুরি অবস্থাও। এরই মধ্যে অনুষ্ঠিত হয়েছে নিহতদের জন্য গণশেষকৃত্য। গতকাল স্থানীয় সময় সকাল সাড়ে ৮টায় নীরবতা পালনের মধ্য দিয়ে শোক ও শেষকৃত্যের অনুষ্ঠান শুরু হয়। রোববার যে সময়ে বোমা হামলা শুরু হয়েছিল, সে সময়টিকেই নীরবতা পালনের জন্য নির্ধারণ করা হয়। এ উপলক্ষে পতাকা অর্ধনমিত রাখা হয় এবং নীরবতা পালনের সময় মানুষ মাথা নত করে শ্রদ্ধা জানায় নিহতদের প্রতি। ওই হামলার পর এখন থমথমে অবস্থা বিরাজ করছে শ্রীলংকায়।

"ক্রাইস্টচার্চের প্রতিশোধ নিতেই এই হামলা" :নিউজিল্যান্ডের ক্রাইস্টচার্চের মসজিদে গুলি চালানোর ঘটনার প্রতিশোধ নিতেই শ্রীলংকায় ইস্টার সানডে উদযাপনের সময় একের পর এক বোমা হামলা চালানো হয়। শ্রীলংকার পার্লামেন্টে গতকাল এক অধিবেশনে দেশের প্রতিরক্ষা প্রতিমন্ত্রী রুয়ান বিজয়বর্ধনে এ মন্তব্য করেন।

তিনি বলেন, প্রাথমিক তদন্তে বের হয়েছে এটি নিউজিল্যান্ডের মসজিদে চালানো হামলার প্রতিশোধ হিসেবে করা হয়েছে। নিউজিল্যান্ডের ক্রাইস্টচার্চে নামাজের সময় গুলি চালিয়ে ৫০ জনকে হত্যার সঙ্গে শ্রীলংকার ঘটনার যোগসূত্র কীভাবে খুঁজে পাওয়া গেল- তার বিস্তারিত জানাননি বিজয়বর্ধনে।

শ্রীলংকার হামলার ঘটনায় দুটি স্থানীয় ইসলামী সংগঠন দায়ী- এমন ধারণা করা হচ্ছে বলেও জানিয়েছেন তিনি। তিনি বলেন, জেএমআইয়ের সঙ্গে মিলে ন্যাশনাল তাওহিদ জামাত এ হামলা চালিয়েছে। জেএমআই বলতে তিনি স্থানীয় আরেকটি ইসলামী গোষ্ঠী জমিয়াতুল মিল্লাতু ইব্রাহিমকে বুঝিয়েছেন।

এ ঘটনা তদন্তে আন্তর্জাতিক সহায়তা চেয়েছে শ্রীলংকা সরকার। এর পরই তদন্তে সহযোগিতার হাত বাড়িয়ে দিয়েছে পুলিশের আন্তর্জাতিক সংস্থা ইন্টারপোল। প্যারিসভিত্তিক এই সংস্থাটি জানিয়েছে, এরই মধ্যে তারা একটি দল কলম্বোয় পাঠিয়েছে, যদি আরও কিছু প্রয়োজন হয়, তাও দিতে তৈরি তারা।

যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প কথা বলেছেন প্রধানমন্ত্রী রনিল বিক্রমাসিংহের সঙ্গে। তিনি জড়িতদের বিচারের আওতায় আনতে সব ধরনের সহায়তার আশ্বাস দিয়েছেন। এরই মধ্যেই এফবিআই এজেন্ট পাঠানো হচ্ছে শ্রীলংকায়।

দায় স্বীকার আইএসের :হামলার দায় স্বীকার করেছে মধ্যপ্রাচ্যের জঙ্গিগোষ্ঠী আইএস। আইএসের বার্তা সংস্থা আমাক গতকাল হামলার দায় স্বীকার করে আরবিতে লেখা একটি বার্তা প্রকাশ করে। তবে সেখানে এই দাবির পক্ষে কোনো প্রমাণ দেখানো হয়নি। ইসলামিক স্টেট সাধারণত তাদের হামলাগুলোর বিষয়ে দ্রুতই দায় স্বীকার করে। এ ক্ষেত্রে কিছু প্রমাণও দেখায় তারা। এবার তিন দিন পর হামলার দায় স্বীকার করল আইএস। তবে যুক্তরাষ্ট্রের গোয়েন্দা সূত্রগুলো বলছে, হামলার ধরন থেকে তারা আইএসের একটা প্রবণতা লক্ষ্য করছে। তারা ল্যাবরেটরি টেস্টের জন্য বিশেষজ্ঞ সহায়তা দেওয়ারও প্রস্তাব করেছে।

বিশ্নেষকরা বলছেন, যেভাবে বিলাসবহুল হোটেল এবং গির্জা লক্ষ্যবস্তু করা হয়েছে, যে সূক্ষ্ণভাবে হামলা চালানো হয়েছে, তাতে স্থানীয় চরমপন্থিদের ওপর বৈশ্বিক জঙ্গি নেটওয়ার্কের প্রভাব অস্বীকার করা যায় না। ছয়-সাতটি ভয়াবহ মাত্রার আত্মঘাতী হামলা চালানো হয়। এর মধ্যে একটি হামলাও ব্যর্থ হয়নি। শ্রীলংকায় গৃহযুদ্ধ চলার সময় বিদেশি পর্যটকদের ওপর হামলার ঘটনা ছিল বিরল। সর্বশেষ হামলায় অনেক বিদেশি নিহত হয়েছেন এবং ফলে আল কায়দা অথবা আইএসের সঙ্গে যোগাযোগের সন্দেহ আরও বাড়ছে।

Facebook Comments

" বিশ্ব সংবাদ " ক্যাটাগরীতে আরো সংবাদ

Web Hosting and Linux/Windows VPS in USA, UK and Germany

Visitor Today : 35

Visitor Yesterday : 114

Unique Visitor : 146037
Total PageView : 152891