স্থানীয়-সরকারব্যবস্থা-শাসক-দলের-কবজায়

স্থানীয় সরকারব্যবস্থা শাসক দলের কবজায়


নেত্রকোনার পূর্বধলা উপজেলা পরিষদের নির্বাচন ছিল ১০ মার্চ। নির্বাচনী প্রচারে প্রভাব খাটানোর অভিযোগে স্থানীয় সাংসদ ওয়ারেসাত হোসেনকে এলাকা ছাড়ার নির্দেশ দেয় নির্বাচন কমিশন (ইসি)। সাংসদ এলাকা ছাড়েন, তবে কয়েক দিন পরই ফিরে আসেন। শেষমেশ নিরপেক্ষ পরিবেশের আশা ছেড়ে নির্বাচন স্থগিত করে ইসি।


Hostens.com - A home for your website

আবার জেলা পরিষদ আইন হওয়ার পর প্রায় ১৬ বছর নির্বাচন হয়নি। ২০১১ সালে সরকার ৬১টি জেলা পরিষদে ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগের নেতাদের প্রশাসক হিসেবে নিয়োগ দিয়েছিল। বাকি ছিল তিন পার্বত্য জেলা পরিষদ, যেখানে হিসাব পুরোটাই আলাদা। অবশেষে ২০১৬ সালের ডিসেম্বরে প্রথম জেলা পরিষদ নির্বাচন হয়।

তবে স্থানীয় সরকারের কোনো প্রতিষ্ঠানই ক্ষমতাসীন দলের নিয়ন্ত্রণমুক্ত নয়। সাংসদদের প্রভাব প্রত্যক্ষ ও প্রবল। সেবামূলক সব কাজ তত্ত্বাবধানের ক্ষমতা প্রতিষ্ঠানগুলোর নেই। নেই প্রশাসনের সঙ্গে সমন্বয়। বিভিন্ন স্তরের প্রতিষ্ঠানগুলোর নিজেদের মধ্যে সমন্বয় নেই, চলছে আলাদা আইনে। বাজেট কেন্দ্রীয় সর
কারের ওপর নির্ভরশীল, কর আদায়ের ক্ষমতা সীমিত।

স্থানীয় সরকারের সবচেয়ে নিচের ধাপ ইউনিয়ন পরিষদ, যেটা মানুষের সবচেয়ে কাছাকাছি থাকে। এর ওপরে আছে উপজেলা পরিষদ আর জেলা পরিষদ। জেলা-উপজেলায় বাড়তি আছে পৌরসভা, বড় নগরে সিটি করপোরেশন। সব মিলিয়ে স্থানীয় সরকারে জনপ্রতিনিধি আছেন প্রায় ৬৭ হাজার।

দীর্ঘদিন কাজ করছেন—এমন কয়েকজন পরিকল্পনাবিদ ও বিশেষজ্ঞ বলেছেন, প্রতিষ্ঠানগুলো শক্তিশালী ও কার্যকর করতে সরকার এযাবৎ শুধু মুখেই নানা প্রতিশ্রুতি দিয়েছে। সরকারের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হচ্ছে, প্রতিশ্রুতি পূরণ করে স্থানীয় সরকারকে সবল ও সক্ষম করে তোলা। ২০৩০ সালের মধ্যে জাতিসংঘঘোষিত টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা (এসডিজি) অর্জন করতে হলে এর বিকল্প নেই।

দেশের সংবিধান অনুযায়ী, নির্বাচিত স্থানীয় সরকার বেশ কিছু সেবাদান ও সরকারি বরাদ্দ সমন্বয় করবে। সেবাকাজ চালানোর জন্য কর বসাবে। সরকারি বরাদ্দ ও নিজস্ব আয়ের ভিত্তিতে বাজেট তৈরি করবে। অথচ অর্থ বরাদ্দ থেকে শুরু করে কাজ করা—অনেক বিষয়েই স্থানীয় সরকারকে মন্ত্রণালয়ের ওপর নির্ভর করতে হচ্ছে।

সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের উপদেষ্টা অর্থনীতিবিদ হোসেন জিল্লুর রহমান প্রথম আলোকে বলেন, ক্ষমতাসীন দলগুলো স্থানীয় সরকারের ক্ষমতায়ন চায় না। ওপরের চাপিয়ে দেওয়া নির্দেশ মানাই স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানের একমাত্র কাজ হয়ে পড়ছে। প্রতিষ্ঠানগুলোর সঙ্গে মানুষের সম্পৃক্ততা কমে গেছে।

সাংসদকবলিত স্থানীয় সরকার

২০০৯ সালের উপজেলা পরিষদ আইন অনুযায়ী স্থানীয় সাংসদ পরিষদের উপদেষ্টা। পরিষদ তাঁর সুপারিশ নিয়ে উন্নয়ন পরিকল্পনা সরকারের কাছে পাঠাবে। সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় সুপারিশ যাচাই-বাছাই করে সিদ্ধান্ত নেবে।

সাংসদেরা নানাভাবে স্থানীয় সরকারে নিজেদের নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার চেষ্টা করেন। সম্প্রতি নাটোরের বড়াইগ্রাম উপজেলার চেয়ারম্যান সিদ্দিকুর রহমান পাটোয়ারী এবং স্থানীয় সাংসদ আবদুল কুদ্দুসের মধ্যে দ্বন্দ্ব দেখা দেয়। চেয়ারম্যান অভিযোগ করেন, সাংসদ বিভিন্ন সময়ে উপজেলার কাজে হস্তক্ষেপ করে আসছেন।

সিদ্দিকুর রহমান গতকাল রোববার প্রথম আলোকে বলেন, ’স্থানীয় সরকারকে শক্তিশালী করতে হলে এমপিদের (সাংসদ) প্রভাবমুক্ত করতে হবে। এলাকার উন্নয়ন পরিকল্পনা করা, প্রকল্প প্রণয়ন, বাস্তবায়নে সাংসদদের প্রভাব থাকে। অথচ এসব বিষয় স্থানীয় সরকারের নির্বাচিত প্রতিনিধিদেরই করার কথা।’

চলমান উপজেলা পরিষদ নির্বাচনেও সাংসদের প্রভাব খাটানোর বিষয়টি আলোচনায় এসেছে। প্রথম ধাপের উপজেলা নির্বাচনের তফসিল ঘোষণার পর থেকেই কিছু এলাকায় স্থানীয় সাংসদেরা আচরণবিধি লঙ্ঘন করে নির্বাচনী প্রচারে অংশ নেন। কিছু ক্ষেত্রে সাংসদদের বিরুদ্ধে দলীয় প্রার্থীর বিপরীতে নিজের পছন্দের ব্যক্তিদের স্বতন্ত্র প্রার্থী করার অভিযোগও ওঠে।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের লোকপ্রশাসন বিভাগের অধ্যাপক সালাহউদ্দিন এম আমিনুজ্জামান মনে করেন, এভাবে স্থানীয় সরকার সাংসদদের ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়েছে। প্রথম আলোকে তিনি বলেন, নির্বাচনে মনোনয়ন থেকে শুরু করে প্রকল্প বাস্তবায়নে প্রভাব থাকে সাংসদদের। ফলে জনপ্রতিনিধিরা মানুষের চাহিদা অনুযায়ী সিদ্ধান্ত নিতে পারছেন না। তাঁদের স্বাধীনতা খর্ব হচ্ছে। স্থানীয় সরকারে সাংসদদের ভূমিকা পুনর্বিবেচনা করার পরামর্শ দেন তিনি।

সমন্বয় ও জবাবদিহির অভাব

পরিবার পরিকল্পনা, স্বাস্থ্য, কৃষি, শিক্ষার মতো সরকারের সেবাদানকারী বিভাগগুলোর সঙ্গে স্থানীয় সরকারের সমন্বয়ের অভাব রয়েছে। মন্ত্রণালয়গুলো নিজেদের মতো পরিকল্পনা তৈরি করে তা মাঠপর্যায়ে বাস্তবায়ন করে। এসব পরিকল্পনা তৈরিতে স্থানীয় জনপ্রতিনিধিদের ভূমিকা থাকে না।

বিভিন্ন সময় স্থানীয় প্রশাসনের সঙ্গে জনপ্রতিনিধিদের মতবিরোধ প্রকাশ্যে এসেছে। গত বছরের ২৬ মে সংবাদ সম্মেলন করে সাতক্ষীরার তালা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার (ইউএনও) অপসারণ দাবি করেন উপজেলা ও ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যানরা। তাঁরা বলেন, সাত দিনের মধ্যে ইউএনওকে প্রত্যাহার না করা হলে বৃহত্তর আন্দোলনে যাবেন। এর পরিপ্রেক্ষিতে ৪ জুন ইউএনওকে বদলি করা হয়।

আবার ইউনিয়ন পরিষদ, উপজেলা পরিষদ, জেলা পরিষদ, পৌরসভা ও সিটি করপোরেশনগুলোর প্রতিটিরই আলাদা আইন আছে। আইনগুলো অনেক ক্ষেত্রে একে অন্যের সঙ্গে সাংঘর্ষিক। সরকারের সপ্তম পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনায় এই আইনগুলোর সমন্বয়ে একক আইন তৈরির সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে, তবে তার কাজ শুরু হয়নি।

ইউনিয়ন পরিষদ আইনে বছরে দুবার ’ওয়ার্ড সভা’ করার বিধান আছে। এই সভায় ভোটাররা বিভিন্ন বিষয়ে তাঁদের মতামত তুলে ধরবেন। কিন্তু সভা নিয়মিত হচ্ছে না। জনপ্রতিনিধিদের জবাবদিহিও নিশ্চিত হচ্ছে না। জনপ্রতিনিধিরা অবশ্য বলছেন, ভোটারদের চাহিদা থাকে অনেক। সেই তুলনায় বরাদ্দ থাকে কম। নানা প্রশ্নের মুখে পড়তে হয় বলে তাঁরা ওয়ার্ড সভা করতে চান না।

পার্বত্য চট্টগ্রামে জেলা পরিষদের জন্য ভিন্ন ব্যবস্থা ভিন্নতর সমন্বয়হীনতা তৈরি করেছে। পার্বত্য চুক্তির আলোকে গঠিত পার্বত্য চট্টগ্রামবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের অধীনে আছে চট্টগ্রাম আঞ্চলিক পরিষদ ও তিন পার্বত্য জেলা পরিষদ। আবার ইউনিয়ন ও উপজেলা পরিষদ হচ্ছে স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়ের অধীন। চুক্তি অনুযায়ী, তিন পার্বত্য জেলার প্রশাসন, আইনশৃঙ্খলা ও উন্নয়নের ব্যাপারে সমন্বয়ের দায়িত্ব আঞ্চলিক পরিষদের।

কিন্তু আঞ্চলিক পরিষদের সদস্য গৌতম কুমার চাকমা প্রথম আলোকে বলেন, আঞ্চলিক পরিষদকে কখনোই আমলে নেওয়া হয়নি। রাজনৈতিক ও আমলাতান্ত্রিক কারণে আঞ্চলিক পরিষদ কার্যকর হয়নি। এই পরিষদকে যথাযথ ভূমিকায় কেউ দেখতে চায়, কেউ চায় না।

নারী প্রতিনিধিরা উপেক্ষিত

স্থানীয় সরকারের প্রতিটি পর্যায়ে সংরক্ষিত আসনে নারীদের সরাসরি নির্বাচন হয়। কিন্তু স্থানীয় সরকারের আইনগুলোতে নারী প্রতিনিধিদের ভূমিকা সুস্পষ্ট নয়। উন্নয়ন পরিকল্পনা বা কাজের ক্ষেত্রে নারীদের ভূমিকা নেই। উপজেলা পরিষদের ১৭টি স্থায়ী কমিটির মধ্যে ৬টির সভাপতি মহিলা ভাইস চেয়ারম্যান। কিন্তু স্থায়ী কমিটিগুলো কার্যকর না হওয়ায় মহিলা ভাইস চেয়ারম্যানরা তাঁদের দায়িত্ব পালন করতে পারেন না।

নাজমুন নাহার বরগুনার বামনা উপজেলার মহিলা ভাইস চেয়ারম্যান ও উপজেলা মহিলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক। তিনি প্রথম আলোকে বলেন, মহিলা ভাইস চেয়ারম্যানদের যথাযথ মূল্যায়ন করা হয় না। সব ক্ষমতাই থাকে চেয়ারম্যানের হাতে। মাসে একটি সভায় উপস্থিত হয়ে শুধু সই করতে হয়। তিনি সুনির্দিষ্ট দায়িত্ব ও ক্ষমতা চাইছেন।

আয় ও সক্ষমতা বাড়াতে হবে

২০১৮-১৯ অর্থবছরে স্থানীয় সরকার বিভাগের পরিচালন ও উন্নয়নের জন্য বরাদ্দ ছিল ২৯ হাজার কোটি টাকার মতো। এটা জাতীয় বাজেটের ৭ শতাংশ। এর মধ্যে ২৫ হাজার কোটি টাকার বেশি অবশ্য উন্নয়ন বাজেট। স্থানীয় কর তাই স্থানীয় সরকারের রাজস্ব আয়ের একমাত্র উৎস। কিন্তু ইউনিয়ন পরিষদ এবং উপজেলা পরিষদ আইন অনুযায়ী পরিষদগুলো পর্যাপ্ত কর আদায় করতে ব্যর্থ হচ্ছে। বিপত্তিতে পড়ছে স্থানীয় সরকারগুলো।

নওগাঁর ধামইরহাট উপজেলার আরানগর ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান মো. শাহজাহান আলী প্রথম আলোকে বলেন, ইউনিয়নের আয় একদম কম। বরাদ্দও পর্যাপ্ত থাকে না। উন্নয়নকাজ স্থানীয় প্রশাসন ঠিকাদারের মাধ্যমে করায়। ইউনিয়ন পরিষদের মতামত নেয় না। জনবল ও বরাদ্দ বাড়ানোর পাশাপাশি উন্নয়নকাজে পরিষদের মতামত নিতে হবে।

আইনে স্থানীয় সরকারকে স্থানীয় পর্যায়ের সরকারি ও সামাজিক নানা ধরনের কাজের দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে। যেমন, এলাকার আইনশৃঙ্খলা রক্ষা, খাল-নদী-জলাশয় রক্ষা, নারীর প্রতি সহিংসতা রোধ বা সরকারের উন্নয়ন কার্যক্রম বাস্তবায়ন। বাস্তবে কিছু অবকাঠামো নির্মাণ, রাজস্ব সংগ্রহ, প্রত্যয়নপত্র প্রদান, কিছু বিচার-সালিস করার মধ্যেই তাদের কাজ সীমিত।

কাজগুলো করার জন্য স্থানীয় সরকারের আর্থিক ও প্রশাসনিক সামর্থ্য গড়ে তোলার পদক্ষেপ সরকার নিচ্ছে না। স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানগুলোর কার্যকলাপের ওপর সরকারের নজরদারিও কম।

প্রতিশ্রুতির কী হবে?

২০১৪ সালে সরকার গঠনের পর ১৭ জুলাই সচিবালয়ে স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয় পরিদর্শন করতে গিয়েছিলেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। তিনি বলেছিলেন, ক্ষমতার বিকেন্দ্রীকরণ করে স্থানীয় সরকারকে আরও শক্তিশালী করা হবে। স্থানীয় সরকারগুলোর স্তর পুনর্বিন্যাস করে পর্যায়ক্রমে স্বাস্থ্য, শিক্ষা, আইনশৃঙ্খলা, অবকাঠামো উন্নয়ন, সামাজিক নিরাপত্তা এবং অন্যান্য উন্নয়ন পরিকল্পনা তাদের হাতে দেওয়া হবে। চলতি বছরের ১০ ফেব্রুয়ারি স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয় পরিদর্শনে গিয়ে প্রধানমন্ত্রী একই প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন।

একাদশ সংসদ নির্বাচনেও আওয়ামী লীগের ইশতেহারে স্থানীয় সরকার গুরুত্ব পেয়েছে। একটি বিশেষ অঙ্গীকারের শিরোনাম ’আমার গ্রাম, আমার শহর: প্রতিটি গ্রামে আধুনিক নগর সুবিধা সম্প্রসারণ’। এর আওতায় যাতায়াত-যোগাযোগ, সুপেয় পানি, সুচিকিৎসা, মানসম্পন্ন শিক্ষা, উন্নত পয়োনিষ্কাশন ও বর্জ্য ব্যবস্থাপনা, বিদ্যুৎ ও জ্বালানি সরবরাহ করার প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছে। এগুলো করতে হলে স্থানীয় সরকারকে বড় ভূমিকা রাখতে হবে।

সুশাসনের জন্য নাগরিকের (সুজন) সম্পাদক বদিউল আলম মজুমদারের মতে, সংবিধানই স্থানীয় নির্বাচিত প্রতিনিধিদের মাধ্যমে স্থানীয় সব সমস্যার সমাধান করতে বলেছে। স্থানীয় সরকার যে স্বায়ত্তশাসিত, কেন্দ্রীয় সরকারের প্রভাব এবং সাংসদের খবরদারিমুক্ত প্রতিষ্ঠান, এটি ক্ষমতাসীন সরকারকে বুঝতে হবে।

 

Facebook Comments

" জাতীয় খবর " ক্যাটাগরীতে আরো সংবাদ

Web Hosting and Linux/Windows VPS in USA, UK and Germany

Visitor Today : 47

Visitor Yesterday : 88

Unique Visitor : 145682
Total PageView : 152634